শীতে বায়ুদূষণ এবং করোনা ঝুঁকি

বায়ুদূষণ, রাজধানীসহ পুরো দেশের মানুষের কাছে অতি পরিচিত একটি দূষণের নাম। বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠে পরিবেশ। ফলে বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস এন্ড ইভ্যালুয়েশন, বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আর বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।

সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে বিপজ্জনক ধুলা ও বস্তুকণা পিএম ২.৫ যদি মাত্র এক মাইক্রোগ্রাম বৃদ্ধি পায় তাহলে সেটি কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে করোনার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া ইতালিতে বায়ুর মান নিয়ে গবেষণাতেও কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার এবং দূষণের উচ্চ স্তরের মধ্যে সংযোগ পাওয়া গেছে। ইতালির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা আরেকটি প্রাথমিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কণায় কোভিড-১৯ আরো বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্প্রতি সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাতেও দেখানো হয়েছে যে বায়ুদূষণের সংস্পর্শে দীর্ঘমেয়াদে থাকা করোনা ভাইরাসে প্রাণহানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। যেহেতু শীতল আবহাওয়ার সময় আর্দ্রতা প্রচণ্ড হ্রাস পায় এবং ধুলার দূষণ মারাত্মক মোড় নেয়, তাই এ সময় কিছু ভাইরাল ফ্লুর উত্থান এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়। শীতের সময় ক্রমবর্ধমান ধুলার দূষণের কারণে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের ব্যাঘাত রোগ, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। লোকজন এমন রোগে ভুগলে, তা করোনা ভাইরাসযুক্ত ফোঁটাগুলোকে (ভেক্টর ড্রপলেট) এখানে সেখানে সহজেই ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে। তাছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিরা এবং যাদের দীর্ঘকালীন শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে তারা শীতের সময় দূষণ এবং করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শীতকালে বায়ুদূষণের পাশাপাশি ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আইন প্রয়োগ এবং জনগণকে অনুপ্রাণিত করে সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কেননা এটিই মানুষকে দূষণ এবং কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

শীতে বায়ুদূষণ থেকে রেহাই পেতে আমাদের পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানা গড়তে হবে। বাতাসে ক্ষতিকারক উপাদান ছড়াতে পারে এমন জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ ও নিষিদ্ধ করতে হবে, ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে, বায়ুতে রাস্তার ধুলাবালি ওড়া বন্ধ করতে বা কমাতে নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে, পশুপাখির মৃতদেহ, ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে, বাইরে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, রাস্তা নির্মাণ বা মেরামতের কাজ দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে হবে, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে- যাতে করে যেখানে সেখানে নগর বর্জ্য বা কৃষি বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পোড়ানো না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে, প্রচলিত আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে ইত্যাদি। এ সমস্যা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার ভেতর পরিবেশবান্ধব মনোভাব তৈরি করতে হবে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অন্যান্য সংস্থা ও জনগণ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সুফল বয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। জাতীয়ভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত, সচেতন হওয়া উচিত।

শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
nipasheikh13@gmail.com

The post শীতে বায়ুদূষণ এবং করোনা ঝুঁকি appeared first on Bhorer Kagoj.

0 Comments

There are no comments yet

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 9 =

Back to top