ছুটিতেও বছর জুড়ে আলোচনায় ইবি

হিম হিম শীতলের পরশে নতুনের সম্ভাবনায় দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২১। আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। তারপরই ইতিহাসের পাতায় উঠে যাবে ২০২০-এর কথা। পড়ে থাকবে শুধু ২০-এর স্মৃতিমাখা বিষাক্ত ঘটনাগুলো। গত এক বছরে এসব স্মৃতিপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়(ইবি)।

করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বছরের শুরু (১৮ মার্চ) থেকেই বন্ধ ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে ছুটিতেও নিয়মিত শিক্ষার্থী বহিষ্কার, শিক্ষক-কর্মকর্তা, ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের কোন্দল-সংঘর্ষ, উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তির রাজনীতিসহ কিছু ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মতো।

৭ এপ্রিল! ঐদিন রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি মাজেদের গ্রেপ্তার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী সাজ্জাদ হোসেন নিজ টাইমলাইনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উক্তি টেনে স্ট্যাটাস দেন।ওই পোস্টে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিদা সুলতানা ছন্দা ‘কমল ছন্দ’ নামে একটি আইডি থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকে ‘পুরাতন কাসুন্দি ঘাটা’ উল্লেখ করে মন্তব্য করেন। তার এমন মন্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা ওই ছাত্রীর শাস্তি ও বহিষ্কারের দাবি জানান। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে ৮ এপ্রিল রাতেই তানজিদা সুলতানাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া কেন তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না এ মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়। একইসঙ্গে  ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটিও করা হয়। এদিকে ঐ ঘটনার পরেরদিনই জাতির পিতাকে কটুক্তির দায়ে আরেক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। ঐ শিক্ষার্থী আশিকুল ইসলাম পাটোয়ারী। তিনি  বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ফেসবুকে নিজ টাইমলাইনে তিনি ‘বঙ্গবন্ধুকে ফেরেশতারূপে হাজিরকরণ’ ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকে ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করে স্ট্যাটাস দেন।পরে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে তাকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করে প্রশাসন। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কেন তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না এ মর্মে কারণ দর্শাতে বলা হয়। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। ওই শিক্ষার্থী ছাত্র মৈত্রী ইবি শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যও ছিলেন। তবে উপরোক্ত ঘটনায় তাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়।

পরে ১৫ জুন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মাদ নাসিমকে নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে কটূক্তি করার অভিযোগে ছাত্র ইউনিয়ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের (ইবি) সাধারণ সম্পাদককে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। ঐ শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম। তিনিও বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধি মোতাবেক তাকে কেন স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না এ মর্মে কারণ দর্শানোর পত্র প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের ই-মেইলে প্রেরণের জন্য বলা হয়। এছাড়া তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করে প্রশাসন।
এসময় সাদিকুলের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার দাবি জানায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন সংসদের নেতা-কর্মীরা। পরে ঐ শিক্ষার্থী তদন্ত কমিটির কাছে তার যৌক্তিক কারণ তুলে ধরে। কমিটি তার কথা শ্রবণ শেষে কারণগুলো লিখিতভাবে দিতে বললে তিনি তা দেন। তবে তার ব্যাপারে প্রশাসন এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাকি দুই শিক্ষার্থীর বিষয়েও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত)  এস এম আব্দুল লতিফ বলেন, তিন শিক্ষার্থীই বিগত ভিসির সময়ে সাময়িক বহিষ্কৃত হয়েছিল। নতুন উপাচার্য আসায় এখনও তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সাদিকের বিষয়টি আগামী সিন্ডিকেটে উঠার কথা রয়েছে।

বছরটা শুরু হয় শাখা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যাকার রাজনৈতিক উত্তাপ দিয়ে।  সভাপতি রবিউল ইসলাম পলাশ ও সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের গ্রুপের সঙ্গে বিদ্রোহীদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। টাকার বিনিময়ে নেতা হওয়া ও নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগ এনে সাধারণ সম্পাদক রাকিবকে বহিষ্কারের দাবিসহ ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে তাকে কয়েক দফায় ধাওয়া দেয় বিদ্রোহীরা। ২১ জানুয়ারী পলাশ ও রাকিব নেতাকর্মীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ফটকে আসেন। এই খবরে বিদ্রোহীরাও ফটকে এসে অবস্থান নেন। পরে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত।  এসময় পলাশ-রাকিবসহ উভয় গ্রুপের ৩০ নেতা-কর্মী আহত হয়।

ওইদিনই বিদ্রোহী গ্রুপের কর্মী হানিফ হোসাইন সম্পাদক রাকিবকে ১নং আসামি করে ইবি থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয় এবং রাকিবকে আটক করে পুলিশ। পরে উক্ত সংঘর্ষের ঘটনায় রাকিবের পক্ষে মামলা করেন তার মা রাশিদা খাতুন। ২৬ জানুয়ারী কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী (দ্বিতীয়) আদালতে বাদী হয়ে তিনি এ মামলা দায়ের করেন।মামলায় বিদ্রোহী গ্রুপের  ৮ নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।

 

এদিকে শিক্ষকদের বিভক্তির রাজনীতিও ছিল বছর জুড়ে আলোচনার মূখ্য বিষয়। বছরের শুরুতেই (৬ জানুয়ারি) ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা দেয় কেন্দ্র অনুমোদিত বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাহবুবুল আরেফিন। ঐদিন দুপুরে মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব ম্যুরালে পুষ্পস্তাবক অর্পনের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। পরে ৩১ জানুয়ারি উক্ত কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় কেন্দ্র।

 

এদিকে পরিষদ থেকে একাংশ বেরিয়ে এসে নতুনভাবে বঙ্গবন্ধু পরিষদ (শিক্ষক ইউনিট) নামে আত্মপ্রকাশ ঘটে আরেক দলের। ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেয় তারা। যার প্রেক্ষিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া উইং থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু পরিষদ (শিক্ষক ইউনিট) নামে দেশে অন্য কোন ইউনিট বা শাখা নেই। একইসাথে এই ইউনিটের সকল তৎপরতা থেকে বিরত থাকার হুশিয়ারীও দেয় কেন্দ্র।

তফসিল অনুযায়ী শিক্ষক ইউনিটির নির্বাচন ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও একটি করে মনোনয়ন জমা পড়ায় নির্বাচনের আগেই  ৪ মার্চ ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে অধ্যাপক রুহুল কে এম সালেহকে সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা জামালকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রগতিশীল শিক্ষকদের মাঝে এমন বিভক্তির রাজনীতির প্রভাবও পড়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে।  সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শেখ আবদুস সালামকে ১৩ তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তবে কোষাধ্যক্ষ পদ শুন্য হওয়ার চারমাস পার হলেও এখনও এ পদে কাউকে নিয়োগ দেয়নি সরকার।

এদিকে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদেও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর দল থেকে বেরিয়ে এসে অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমানকে আহবায়ক ও অধ্যাপক এ এস এম শরফরাজ নেওয়াজকে সদস্য সচিব করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাদা দল’ গঠিত হয়।  পরে সংগঠনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ১২ অক্টোবর একযোগে পদত্যাগ দেখান জিয়া পরিষদের ১৭ জন শিক্ষক। নিজেদের কর্মকাণ্ড সংগঠনের নীতি আদর্শ বিরোধী উল্লেখ করে ১৭ অক্টোবর অধ্যাপক  এ এস এম শরফরাজ নেওয়াজ ও অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমানকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করে ইবি জিয়া পরিষদ।

 

এদিকে কর্মকর্তাদের মাঝেও বছরের শুরু থেকে বিভক্তির চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি কর্মকর্তা সমিতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশন’র যাত্রা শুরু হয়। এতে উপ-রেজিস্ট্রার আলমগীর হোসেন খানকে আহবায়ক করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। তবে এ সংগঠনকে অনির্বাচিত ও অনিবন্ধিত উল্লেখ করে শুরু থেকেই বিরোধীতা করে আসছিল কর্মকর্তা সমিতির নির্বাচিত সদস্যরা। যার প্রভাব বিভিন্ন জায়গায় পরিলক্ষিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ফোনকলে অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর মোর্শেদুর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ তোলেন তিনি। পরেরদিন ইবি থানায় তিনি একটি সাধারণ ডায়েরীও করেন।

সর্বশেষ গত ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বর শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে কর্মকর্তারা। দফায় দফায় সংঘটিত এ সংঘর্ষের সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

এছাড়া মেগা প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকিদান-বারবার পদত্যাগের ঘোষণা ও পদত্যাগপত্র জমাদান, ডেস্ক ক্যালেন্ডার সহ বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধু-প্রধানমন্ত্রীর নামের বানান ভুলকরণ ও সেই প্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রারকে শোকজকরণ, শিক্ষক নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগে সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান সহ ৩ শিক্ষককে দুর্নীতি কমিশনে তলব, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বিভিন্ন বিভাগের ২২ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি প্রদান, ছাত্রীর সঙ্গে অশ্লীল প্রেমালাপ ফাঁসের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে শোকজ ও টিএসসিসির পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অব্যহতিদান, ইবি ছাত্রী তিন্নীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলন এবং ফিল্ড ওয়ার্ক শেষে ফেরার পথে দূর্ঘটনার কবলে পড়ে শিক্ষকসহ ৪০ শিক্ষার্থী আহতের ঘটনাও ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গত একবছরের বহুল আলোচিত ইস্যু।

The post ছুটিতেও বছর জুড়ে আলোচনায় ইবি appeared first on Bhorer Kagoj.

0 Comments

There are no comments yet

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 17 =

Back to top