বায়ুদূষণ পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব

ঢাকার বায়ুমান আবারও চরম অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় পৌঁছেছে। মারাত্মক বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এয়ার ভিজুয়ালের তথ্যানুযায়ী ঢাকার বায়ুমান ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় ৭ গুণ বেশি দূষিত। বায়ুমান সূচকে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক দূষণের মাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় আর ঢাকা মহানগরী রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক দূষিত শহরের তালিকায় ১ নম্বরে ঢাকা। ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে সূ² ধূলিকণা ৩২৯.২ মাইক্রোগ্রাম। জনবহুল ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই দূষিত বাতাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। মূলত নির্মাণকাজের নিয়ন্ত্রণহীন ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা প্রভৃতির কারণে রাজধানীতে দূষণের মাত্রা চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে এ শহরের চারপাশে অবস্থিত ইটভাটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নয়, পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। শ্বাসযন্ত্রের রোগ ও দীর্ঘ সময় দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার, বিকলাঙ্গতা, শ্বাসযন্ত্রের দুর্বলতার কারণে মৃত্যু, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ নিউমোনিয়ার মতো রোগের কারণও বায়ুদূষণ।
ঢাকার জনস্বাস্থ্য রীতিমতো হুমকির মুখে, বিপন্নপ্রায়। শ্বাসকষ্ট, সর্দি-হাঁচি-কাশি, হাঁপানি, ফুসফুসের অসুখ-বিসুখ নগরবাসীর প্রায় নিত্যসঙ্গী। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণটিকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে। নাসা পর্যবেক্ষণে দেখেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপান বায়ুদূষণের লাগাম টেনে ধরতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও অবশ্য কর্তব্য হবে সেসব দেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে বায়ুদূষণের মাত্রা যথাসম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, দূষণ নিরোধ দূরে থাক, তা নিয়ন্ত্রণেরও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। শুধু বায়ুদূষণই নয়, ঢাকা এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নগরীতে ফাঁকা জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জায়গার তুলনায় কংক্রিটের বাড়িঘরের ঘনত্ব অনেক বেশি। একের পর এক হাইরাইজ ভবন রোদের উত্তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত ধোঁয়া, সড়কের ধুলাবালি, শিল্প-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যুক্ত হয়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। একটি নগরীতে বায়ুদূষণ রোধ এবং নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা থাকা দরকার, ঢাকা থেকে তা হারিয়ে গেছে।
বাতাসকে দূষণমুক্ত রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি নির্মাণাধীন নতুন ভবন ও রাস্তাঘাটের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা। শিল্প-কলকারখানা শহর থেকে দূরে স্থাপন, কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পবর্জ্যরে নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত অত্যাবশ্যক। ত্রæটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। ইটের ভাটা স্থাপন এবং ভাটায় চিমনি ব্যবহারের মাধ্যমে কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে যথাযথ নিয়ম মেনে চলার বিধান করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তার পাশে উন্মুক্ত ডাস্টবিন স্থাপন বন্ধ করতে হবে। নদীর পাড়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প, লঞ্চ, স্টিমার নির্মাণ ও মেরামতকালে পানিতে তৈলাক্ত বর্জ্যরে মিশ্রণ প্রতিহত করতে পারলে দূষণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। নির্মাণকাজে যাতে ধুলা কম হয় সে জন্য দেশের প্রচলিত আইন মানলেই যথেষ্ট। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না এবং এ বিষয়ে তদারকির ঘাটতি রয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে তদারকি বাড়াতে হবে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ।
samymolla@gmail.com

The post বায়ুদূষণ পরিবেশ ও অর্থনীতিতে প্রভাব appeared first on Bhorer Kagoj.

0 Comments

There are no comments yet

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 8 =

Back to top