পাঁচ কারণে বাড়ছে ডেঙ্গু!

** কীটনাশকের মান ও প্রয়োগে গলদ ** ডেঙ্গুর প্রজনন স্থল ধ্বংসে নজর নেই ** মনিটরিং ব্যবস্থা ভঙ্গুর ** লোক দেখানো অভিযান ** জনসচেতনতার অভাব **

ডেঙ্গুজ্বরে কাঁপছে নগরবাসী। কাঁপন শুরু হয়েছে গোটা দেশেই। মশার ভয়ে ঘুম হারাম নগরবাসীর। সতর্ক, সচেতন থেকেও রক্ষা মিলছে না। সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে হু হু করে ডেঙ্গুরোগী বাড়ছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। পরিস্থিতি ঠেকাতে আধুনিক সব প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মাঠে নামলেও কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ।

রাজধানীর প্রতিটি ভবনের বেজমেন্ট কিংবা পরিত্যক্ত পাত্র এখন এডিস মশার প্রজননস্থল। অট্টালিকা কিংবা বস্তি বাড়ি, কোথাও স্বস্তি নেই। বছরের শুরুতে বিভিন্ন সার্ভে করে গত বছরগুলোর তুলনায় এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে বলে বারবার সতর্ক করেছিলেন কীটতত্ত্ববিদরা। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিধনে বেশকিছু দিক-নির্দেশনাও ছিল তাদের। কিন্তু এই ভরা মৌসুমে যখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন সিটি করপোরেশনের ডেঙ্গু নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের দাবি- ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাড়ানো হয়েছে অতিরিক্ত জনবল। এছাড়া কীটনাশক ছিটানো, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, চিরুনি অভিযান, নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছের চাষ, ইন্ট্রিগেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু, প্রচারণামূলক সভা-সমাবেশ, পোস্টার-র‌্যালি কর্মসূচি, সর্বপরি মশার অস্তিত্ব খুঁজতে ড্রোনের মাধ্যমে সার্ভেসহ আধুনিক সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থা দুটি। এত আয়োজনের পরেও কেন নিয়ন্ত্রণহীন ডেঙ্গু? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজছে নগরবাসী।

অন্যদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চেষ্টার কমতি নেই দাবি করে সিটি করপোরেশন বলছে, জনগণ সচেতন না হলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূল কাজের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে সিটি করপোরেশন লোক দেখানো কর্মসূচিতে ব্যস্ত। সারাবছর কাজ না করার কারণে এডিস মশার প্রকোপ এবং ডেঙ্গুরোগী বাড়ছে। তাদের দাবি, সিটি কর্পোরেশন লোক দেখানো গতানুগতিক কাজ করছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না নিলে কাজে গতি আসবে না বলে ভোরের কাগজেকে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জ সিটি করপোরেশনগুলো কতটা নিতে পেরেছে সেটাই বড় প্রশ্ন। তাছাড়া এসব সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আধুনিক যেসব কার্যক্রম চালাচ্ছে তা সত্যিকার অর্থে কতটা কার্যকর হলো সেদিকে নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, মশা মারার জন্য যেসব ওষুধ কেনা হয়, সেগুলো কার্যকর কিনা এবং সেগুলো ঠিকমতো প্রয়োগ হচ্ছে কিনা, তা তদারকি হচ্ছে না।

সিটি কর্পোরেশনে নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোর অবস্থা আরো খারাপ। উপযুক্ত লোক দিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত না ভালো জরিপ করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।

লোক দেখানো অভিযান: ডেঙ্গুমৌসুম শুরুর পর থেকে মেয়রের নেতৃত্বে কয়েক দফায় ১০ দিন করে মশক নিধন অভিযান চালিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, কারখানাসহ বহুতল ভবনে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে সংস্থা দুটি। এসব অভিযানে যেসব ভবনে লার্ভা পাওয়া গেছে সেসব বাড়ির মালিককে দশ হাজার থেকে বিশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু বাড়ির মালিকদের উদাসীনতার জন্য ডেঙ্গুর লার্ভা জন্ম নেয়ার অপরাধে কারো বাড়ির কাজ বন্ধ করেনি সিটি কর্পোরেশন। ফলে কোটি টাকা দিয়ে নির্মাণকৃত বাড়ির মালিকদের এসব জরিমানা ‘গা সওয়া’ হয়ে গেছে। এই সুযোগে নির্মাণাধীন ভবন থেকেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু লার্ভা জন্ম নিচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঢাকায় নির্মাণাধীন ভবনে এডিসের লার্ভা বেশি। সিটি কর্পোরেশন এসব জায়গায় জরিমানা করে। তবে শুধু জরিমানা করলেই হবে না। লোকজনকে যতদিন না সচেতন করা যায়, ততদিন কাজ হবে না। তাছাড়া সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব কোনো জরিপ ব্যবস্থা নেই। তারা মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপেরই ওপর নির্ভর করে। অভিযোগ রয়েছে, জরিপে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না। তাই এডিস মশার সঠিক চিত্রও পাওয়া যায় না।

কীটনাশকের মান ও প্রয়োগে গলদ: অভিযোগ রয়েছে মশা মারতে যে কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে তা এডিস মশা মারতে পারে না। তাছাড়া দীর্ঘদিন একই ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করায় মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই ওষুধে সুফল মিলছে না।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের মার্চের পর মশক নিয়ন্ত্রণে নতুন কার্যকর কোনো ওষুধ আমদানি করতে পারেনি দুই সিটি করপোরেশন। এছাড়া ভেজাল ওষুধ সরবরাহ, ট্রায়াল শেষ না হতেই ওষুধ কেনা, ওষুধে পানি মিশিয়ে ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ ছিটানোসহ মশা নিয়ন্ত্রণে যাবতীয় কাজে গাফিলতি রয়েছে। মশককর্মীদের কার্যক্রমও কাউন্সিলরা মনিটরিং করছেন না।

বিশেষ করে ডিএসসিসিতে ব্যবহৃত ওষুধের বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও মিক্সিং। অতিরিক্ত পানি মিশিয়ে ওষুধ ছিটানোয় কোনো কাজে আসছে না। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধগুলো আগে এরোসল ও কয়েল কোম্পানিতে বিক্রি হতো। এরাই ওষুধ কিনে নিয়ে নগর ভবনের ওষুধের সঙ্গে পানি মিশিয়ে দিচ্ছে।

এছাড়া মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের দাবি- ডিএনসিসিতে ডেঙ্গুর লার্ভা মারতে ব্যবহৃত নোভালিউরন ট্যাবলেটে মশা মরছে না। এই ট্যাবলেট যে প্রাণীর দেহে ‘কাইটিন’ নামে একটি উপাদান রয়েছে, শুধু সেসব প্রাণীর লার্ভা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোবাইদুর রহমান বলেন, মেলাথিয়ন এলাকাভিত্তিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। মেলাথিয়ন-ফিফটি সেভেন ই-সি ফগিংয়ের জন্য দেয়া হচ্ছে। এছাড়া টেমিফস-৫০ ইসি লার্ভিসাইট করা হচ্ছে। ম্যালেরিয়া ওয়েল-বি, নোভালুরন ট্যাবলেট দিয়েছি বাড়ি বাড়ি লার্ভা নষ্ট করতে। তিন মাস পর্যন্ত এই ট্যাবলেটের কার্যকারিতা থাকে। তবে ৩ মাস অপেক্ষা না করে ১ মাস পর আবারো ট্যাবলেট দিচ্ছি।

তিনি বলেন, এসব কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ, এগুলো সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ল্যাব, আইডিসিআর ও প্ল্যান্ট প্রটেকশন ইউনিট থেকে পরীক্ষা করে শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়েই আমরা প্রয়োগ করি।

এডিসের প্রজনন স্থল ধ্বংসে নজর নেই: সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের প্রাকমৌসুম তালিকায় ছিলো- এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে বাড়ির আশপাশের আবর্জনা পরিষ্কার করা। বাস টার্মিনাল ও বাস ডিপো, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন বাড়ি, মেট্রোরেল প্রকল্প, চিড়িয়াখানা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, থানার পরিত্যক্ত গাড়ি ইত্যাদি স্থান ও স্থাপনা পরিদর্শন করে এসব জায়গায় জমা পানি ফেলে দেয়াসহ মশার জন্মস্থান ধ্বংস করতে জনগণের অংশ নেয়া নিশ্চিত করা। এ কাজে আলাদা টিম প্রস্তুত করে ওয়ার্ড কাউন্সিলররা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার এলাকার বর্জ্যকর্মীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাবেন এবং মাঠপর্যায়ে অভিযানের রিপোর্ট ও কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানানোর নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকর হয় না।

ডিএনসিসির ৩৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ বলেন, আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। যেখানে ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে জরিমানা করছে। আমরাও খেয়াল রাখছি। শুধু আমরা কার্যক্রম চালালে হবে না। নগরবাসীরও সচেতন হতে হবে। বাসা-বাড়ি তারা ঠিকমতো পরিষ্কার না রাখলে মশা তো হবেই।

মনিটরিং ব্যবস্থা ভঙ্গুর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পুরো প্রক্রিয়া মনিটরিং টিমের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। নগর ভবন থেকে ৭টি সমন্বয় টিমের মাধ্যমে কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি করে দেয়ার ঘোষণাও কার্যকর হয়নি। এছাড়া জোনভিত্তিক পরিচ্ছন্ন অভিযান ও সার্ভের সময় কীটতত্ত্ববিদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে করপোরেশনের মনিটরিং টিম দেয়া হয় না। ফলে কাউন্সিলরা কী করছে, মশককর্মীরা কয় ঘণ্টা কাজ করছে, কোন এলাকায় কখন কীটনাশক ছিটাচ্ছে এসব বিষয়ে সম্পূর্ণই অন্ধকারে কর্মকর্তারা।

ফাইলবন্দি সমন্বিত কার্যক্রম: বছরের শুরুতেই মশা মারতে এবার দুই সিটি করপোরেশন মিলে সমন্বিত প্রস্তুতি ও কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। এ লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছিল বছরব্যাপী মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের কর্মপরিকল্পনা। ডেঙ্গুর প্রাকমৌসুম, মূলমৌসুম এবং মৌসুম পরবর্তী পরিকল্পনা এক সঙ্গে লিপিবদ্ধ করা হয়। তবে পরিকল্পনা মাফিক কার্যক্রম জোরদার করতে পারেনি সংস্থা দুটি। ডিএনসিসি তৎপর হলেও ডিএসসিসি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ উদাসীন। সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দুই সিটি মিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি বৈঠকও করেনি।

জনসচেতনার অভাব: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে জনসচেতনমূলক কার্যক্রমে। মশক নিধন কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে ইতোমধ্যেই কাউন্সিলরদের নিয়ে সপ্তাহে অন্তত একবার সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। এছাড়া সবাই মিলে ‘১০টায় ১০ মিনিট প্রতি শনিবার, নিজ নিজ বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ স্লোগানটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চলমান সামাজিক আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে নিজে মাঠে নামেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। কিন্তু তারপরও নগরবাসীর নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে উদাসীনতা রয়েছে। রান্নাঘরে থালা-বাসন রাখার ঝুড়ি, ব্রাশের পট, বাথরুমের অব্যহৃত কমোড, বারান্দায় ফলের টব অনেকেই পরিষ্কার রাখছেন না। ফলে ওসব বাড়িতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই বাসায় চিকিৎসা নিলেও সিটি কর্পোরেশনকে তথ্য দেন না। ফলে সিটি কর্পোরেশনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী মো. সেলিম রেজা বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে ডিএনসিসির রিসোর্স বাড়ানো হয়েছে। মশা নির্মূলে গবেষণা করে সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র (হটস্পট) চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করতে বাড়ি বাড়ি চিরুনি অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএনসিসির চার হাজার কর্মী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ডেঙ্গু নিধনের ‘নোভানিউরন’ ট্যাবলেট বাড়ি বাড়ি বিতরণ করা হবে। এরপরও কেউ সচেতন না হলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানা করা হবে।

The post পাঁচ কারণে বাড়ছে ডেঙ্গু! appeared first on Bhorer Kagoj.

0 Comments

There are no comments yet

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 2 =

Back to top